রাম রহিমের সেই সাধ্বীর চিঠি

রাম রহিমের সেই সাধ্বীর চিঠি

SHARE
The naked letter of Ram Rahim

হরিয়ানার কথিত ধর্মগুরু রাম রহিমকে কেন্দ্র করে ভারত এখনও সরগরম। নারী ভক্তকে ধর্ষণের দায়ে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। গত ২৮ অগাস্ট সাজা ঘোষণা করা হয় তার। রাম রহিম সিং-কে ২০ বছরের সাজা দিয়েছে দেশটির আদালত।

প্রায় ১৫ বছর আগে, ২০০২ সালের মে মাসে রাম রহিমের সাবেক এক নারী ভক্ত (সাধ্বী) তাঁর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তুলে বেনামে চিঠি লেখেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি ও পাঞ্জাব-হরিয়ানা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে। ওই নারীর অভিযোগ, হরিয়ানার শহর সিরসায় ডেরা সচ সউদ গোষ্ঠীর প্রধান কার্যালয়ে রাম রহিম তাঁকে যৌন নির্যাতন করেন।

সেই চিঠি ২০০২ সালের মে মাসে দেশ সেবক নামক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরে অবশ্য সিবিআই জানায়, চিঠিটি প্রকাশের কারণে ওই পত্রিকার সাংবাদিক রামচন্দ্র ছত্রপতিকে হত্যা করা হয়। কী ছিল ওই চিঠিতে, তা সম্প্রতি প্রকাশ করেছে আনন্দবাজার পত্রিকা।

শ্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি
প্রধানমন্ত্রী, নয়াদিল্লি

আমি পাঞ্জাব থেকে আসা মেয়ে। সিরসার (হরিয়ানা) ডেরা সচ সউদে একজন সাধ্বী হিসেবে সেবা করে চলেছি পাঁচ বছর ধরে। আমার মতো আরও কয়েক শ মেয়ে এখানে রয়েছেন, যাঁরা প্রতি দিন ১৮ ঘণ্টা করে সেবা করে চলেছেন।

কিন্তু এখানে আমরা যৌন নির্যাতনের শিকার। ডেরায় মেয়েদের ধর্ষণ করেন ডেরা মহারাজ (গুরমিত সিংহ)। আমি একজন স্নাতক। ডেরা মহারাজের ওপরে আমার পরিবারের অন্ধবিশ্বাস‌‌। পরিবারের সেই অন্ধবিশ্বাসের জেরেই আজ আমি একজন সাধ্বী। সাধ্বী হওয়ার বছর দুয়েক পর একদিন রাত ১০টা নাগাদ হঠাৎ এক মহিলা ভক্ত আমার ঘরে আসেন। জানান, মহারাজ আমাকে ডেকেছেন। মহারাজ স্বয়ং ডেকে পাঠিয়েছেন শুনে খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েছিলাম। সাধ্বী হওয়ার পর সেটাই তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে তাঁর ঘরে ঢুকি। দেখলাম, ওনার হাতে একটা রিমোট এবং টিভিতে তিনি ব্লু  ফিল্ম দেখছেন। বিছানায় তাঁর বালিশের পাশে একটা পিস্তল রাখা ছিল। এসব দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই। ভীষণ নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। এরপর মহারাজ টিভিটা বন্ধ করে দেন। আমাকে ঠিক তাঁর পাশে নিয়ে গিয়ে বসান। খাওয়ার জন্য এক গ্লাস জল দেন। তারপর খুব আস্তে করে বলেন, ডেকে পাঠানোর কারণ, আমাকে তিনি নিজের খুব কাছের বলে মনে করেন। এটাই ছিল আমার প্রথম অভিজ্ঞতা।

এরপরই তিনি এক হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে তাঁর আরও কাছে টেনে নেন। কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলেন, আমাকে তিনি হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসেন। আমার সঙ্গে সহবাস করতে চান। বলেন, তাঁর শিষ্যা হওয়ার সময়ই আমার সমস্ত সম্পদ, আমার শরীর এবং আত্মা তাঁর কাছে উৎসর্গ করেছি এবং তিনি তা গ্রহণও করেছেন। আমি বাধা দিলে তিনি বলেন, ‘আমি ঈশ্বর, এতে তো কোনো সন্দেহ নেই।’ আমি তাঁকে বলি, ঈশ্বর কখনো এ রকম করেন না। আমাকে বাধা দিয়ে তিনি বলেন:
১. শ্রীকৃষ্ণও ঈশ্বর। তাঁর ৩৬০ জন গোপী ছিলেন। যাঁদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ প্রেমলীলা করতেন। আমাকেও সবাই ঈশ্বর বলে মানে। এতে এত অবাক হওয়ার কিছু নেই।
২. আমি তোমাকে এখনই এই পিস্তল দিয়ে খুন করতে পারি। তোমার লাশ এখানেই পুঁতে দেব। তোমার পরিবারের প্রতিটা সদস্য আমার অন্ধ ভক্ত। তুমি খুব ভালো করেই জানো, তাঁরা কখনোই আমার বিপক্ষে যাবেন না।
৩. সরকারের ওপরেও আমার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। পাঞ্জাব, হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রের অনেক মন্ত্রীও আমার কাছে আসেন। আমার প্রতি তাঁদের ভক্তি দেখান। রাজনীতিবিদেরা আমার কাছ থেকে সাহায্য নিতে থাকেন। সুতরাং, তাঁরাও আমার বিরুদ্ধে কোনো রকম পদক্ষেপ করবেন না। আমি তোমার পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরি কেড়ে নেব এবং তাঁদের সেবাদার দিয়ে খুন করাব। আর সেই খুনের কোনো প্রমাণ থাকবে না। তুমি খুব ভালো করেই জানো, ডেরা ম্যানেজার ফকিরচাঁদকেও আমি গুন্ডা দিয়ে খুন করিয়েছি। এখনো সেই খুনের কিনারা হয়নি। ডেরার দৈনিক আয় এক কোটি। এই টাকা দিয়ে আমরা রাজনীতিক নেতা, পুলিশ, এমনকি বিচারক সকলকেই কিনে ফেলতে পারি।

ঠিক এরপরই মহারাজ আমাকে ধর্ষণ করেন। তিন বছর ধরেই মহারাজ এভাবে আমাকে ধর্ষণ করে আসছেন। প্রতি ২৫ থেকে ৩০ দিন অন্তর আমার পালা আসে। আমি জানতে পেরেছি, আমার মতো যতজন সাধ্বীকে তিনি তলব করেছেন, তাঁদের সবাইকেই ধর্ষণ করেছেন। বেশির ভাগেরই বয়স এখন ৩০ থেকে ৪০। বিয়ের বয়স পেরিয়ে গিয়েছে। তাঁদের কাছে এখন ডেরার এই আশ্রয় ছাড়া আর কোনো অবলম্বন নেই।

এই মহিলাদের বেশির ভাগই শিক্ষিত। কারও স্নাতক তো কারও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে। কিন্তু তাঁরা তা সত্ত্বেও এই নরকবাস করছেন। কারণ একটাই, মহারাজের ওপরে তাঁদের পরিবারের অন্ধবিশ্বাস‌‌। আমরা সাদা পোশাক পরি, মাথায় স্কার্ফ বাঁধি, পুরুষদের দিকে চেয়ে দেখি না। পুরুষদের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন হলে ৫-১০ ফুট দূরত্ব বজায় রাখি। কারণ, এসবই মহারাজের ইচ্ছা। তাঁর কথামতোই আমরা এখানে চলাফেরা করি। সাধারণ মানুষ আমাদের দেবী গণ্য করেন। কিন্তু তাঁরা জানেন না, ডেরাতে আমরা আসলে রক্ষিতা। ডেরা এবং মহারাজের আসল সত্যিটা আমি আমার পরিবারকে জানানোর চেষ্টা করেছিলাম। তাতে তাঁরা আমাকেই বকাবকি করে। জানায়, ডেরায় স্বয়ং ঈশ্বরের (মহারাজ) বাস। সুতরাং, এর থেকে ভালো জায়গা আর নেই। এবং ডেরা সম্পর্কে যেহেতু আমার মনে খারাপ ধারণা জন্মেছে, তাই আমার উচিত ‘সদ্‌গুরু’-র নাম করা। শেষ পর্যন্ত আমাকে মহারাজের সমস্ত আদেশ পালন করতেই হয়, কারণ আমি সব মিলিয়ে অসহায়।

এখানে কাউকেই অন্যদের সঙ্গে বেশি কথা বলতে দেওয়া হয় না। পাছে ডেরার সত্য ফাঁস হয়ে যায়, তাই টেলিফোনেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয় না। কোনো সাধ্বী যদি মহারাজের এই আচরণ ফাঁস করে দেন, তাহলে মহারাজের আদেশমতো তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয়। কিছুদিন আগে, ভাতিন্দার এক তরুণী মহারাজের এই সমস্ত নির্যাতনের কথা পরিবারকে জানান। মহারাজের নির্দেশে সমস্ত সাধ্বী মিলে তাঁকে বেধড়ক পেটান। মেরুদণ্ডে গুরুতর চোট নিয়ে তিনি এখন শয্যাশায়ী। তাঁর বাবা ডেরায় কাজ করতেন। কাজে ইস্তফা দিয়ে বাড়ি ফিরে যান। মহারাজের ভয়ে এবং আত্মসম্মানের কথা ভেবে মুখ খোলেননি।

একই ভাবে, এই নির্যাতনের শিকার হন কুরুক্ষেত্রের এক তরুণীও। ডেরা ছেড়ে বাড়ি চলে যান তিনি। তাঁর কাছ থেকে এসব কথা জানার পর তাঁর ভাইও ডেরার কাজ থেকে ইস্তফা দিয়ে চলে যান। পাঞ্জাবের সঙ্গরুর এক তরুণী সাহস করে বাড়ি ফিরে ডেরার ভয়ংকর দিকটা সবাইকে জানিয়েছিলেন। পরদিনই ডেরার অস্ত্রধারী সেবাদার বা গুন্ডারা তাঁর বাড়িতে পৌঁছে যান। মুখ খুললে তাঁকে খুনের হুমকি দেন।

একই ভাবে মানসা, ফিরোজপুর, পাতিয়ালা ও লুধিয়ানা থেকে এখানে আসা তরুণীরাও ভয়ে ডেরা নিয়ে কিছু জানাতে চাননি। তাঁরা ডেরা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কিন্তু তারপরও খুন হওয়ার ভয়ে মুখ বন্ধ করে আছেন। সিরসা, হিসার, ফতেয়াবাদ, হনুমানগড় এবং মেরঠের তরুণীরাও মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন।

আমিও যদি আমার নাম জানাই, তাহলে আমাকে এবং আমার পরিবারকে খুন করা হবে। সাধারণ মানুষের স্বার্থেই এই সত্য আমি সামনে আনতে চাই। এই মানসিক চাপ আর নির্যাতন সহ্য করতে পারছি না। খুব বিপদে রয়েছি। সংবাদমাধ্যম বা সরকারি কোনো সংস্থা যদি তদন্ত চালায়, তাহলে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ জন সাধ্বী এগিয়ে এসে এই সত্য জানাবেন, আমি নিশ্চিত। আমাদের ডাক্তারি পরীক্ষা করা হোক। আমরা আদৌ সাধ্বী কি না, তা জানা হোক। পরীক্ষায় যদি প্রমাণ হয় যে আমদের কুমারীত্ব নেই, তাহলে তদন্ত করে জানা হোক, কে আমাদের সতীত্ব হরণ করেছেন।

তাহলেই সত্য বাইরে আসবে। মহারাজ গুরমিত রাম রহিম সিংহই যে আমাদের জীবন নষ্ট করেছেন, তার প্রমাণ মিলবে।

(২৫.০৯.২০০২ সালে দেশ সেবক নামক পত্রিকায় এই চিঠিটা প্রকাশ পায়। মহারাজ রাম রহিমের নির্যাতন আর মেনে নিতে না পেরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে চিঠিটি লিখেছিলেন এক তরুণী সাধ্বী। সেই চিঠির খবর প্রকাশ্যে আসার পরই রাম রহিমের বিরুদ্ধে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন।)

LEAVE A REPLY