ভেবেছিলাম, ঘনিষ্ঠ সময় কাটালে আমাকে ভালোবাসবে

ভেবেছিলাম, ঘনিষ্ঠ সময় কাটালে আমাকে ভালোবাসবে

SHARE
Problem

সমস্যা

আমি স্নাতক তৃতীয় বর্ষে পড়ি। উচ্চমাধ্যমিকে থাকতে এক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক হয়। তবে তা অনেকটা একপক্ষীয়। তবু আমি সবকিছুর বিনিময়ে তাকে নিজের করে নিতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, আমার পাহাড় সমান ভালোবাসাকে সে অগ্রাহ্য করতে পারবে না, একসময় সে আমাকে ভালোবাসবে। ভেবেছিলাম, ঘনিষ্ঠ সময় কাটালে আমাকে ভালোবাসবে ; তা–ই করেছি। এটা আমার বন্ধুরা অনেকে জানে। কিন্তু ভালোবাসেনি। আমার প্রতি তার ন্যূনতম শ্রদ্ধাটুকুও নেই। এখন মনে হয় আমি ভুল ভেবেছি। পাঁচ বছর পরও সে শুরুর মতোই অবহেলা করে চলেছে। তাই এ বিষয়গুলো আমাকে পীড়া দেয়। ছোটবেলা থেকে আমি প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে বড় হয়েছি। তবু কখনো আপস করিনি। এখন হেরে যাব ভেবে কষ্ট হয়। কিছুতেই মন দিতে পারি না। কী করব আমি?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

পরামর্শ

তুমি লিখেছ, উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় একজনের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক হয়। তবে সেই সম্পর্কটি কীভাবে শুরু হয় বা এর ধরনটি কেমন ছিল তা স্পষ্ট করে জানাওনি। তোমরা কি শুধু বন্ধুত্বের সম্পর্ক দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলে? সেটির সূত্র ধরে পরবর্তী সময়ে তোমার দিক থেকে ওর প্রতি বিশেষ অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে? তুমি কি কখনো যথেষ্ট শ্রদ্ধার সঙ্গে মেয়েটিকে স্পষ্টভাবে বলেছ যে তাকে তুমি ভালোবাসতে শুরু করেছ? এ ছাড়া ‘সবকিছুর’ বিনিময়ে বলতে তুমি কী বুঝিয়েছ তা পরিষ্কার হয়নি। তাকে কি তুমি নিজের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়েছ? এমনকি হয়েছে যে তুমি নিজের ক্ষতি করে হলেও সারাক্ষণ ওকে খুশি করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে গেছ?

এ ধরনের ক্ষেত্রে যে সম্ভাবনাটি তৈরি হয় তা হচ্ছে অন্য মানুষগুলো তাদের নিজের অজান্তেই আমাদের ব্যবহার করতে শুরু করে। তারা এটিকে তাদের একটি অধিকার হিসেবে দেখতে শুরু করে। আর যে মানুষগুলো নিজেদের চাহিদাগুলোকে পাশ কাটিয়ে অবহেলা ও অশ্রদ্ধাকে অগ্রাহ্য করে শুধু দিতে থাকে, তারা দিনে দিনে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পরিশেষে দেখা যায়, সে মানসিক বিষাদে ভুগতে শুরু করে। ভেতরে প্রচুর শূন্যতা তৈরি হয় বলে খুব অসহায়ও বোধ করে। এ অসহায়ত্ব তখন তাদের নিজের প্রতি, অন্যদের প্রতি এবং জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। তখন প্রচণ্ড রাগ ও ক্ষোভ তৈরি হয় এবং নিজেকে ব্যবহৃত ও অপ্রয়োজনীয় মনে হতে থাকে।

তুমি মেয়েটির প্রতি অনুরাগ থেকে তাকে জয় করার জন্য বেশি ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করতে গিয়ে ওর প্রতি মানসিকভাবে খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছ বলেই এখন আরও বেশি কষ্ট হচ্ছে। হয়তোবা শৈশবে প্রতিকূল অবস্থায় বড় হওয়ার কারণে যতটুকু প্রয়োজন সেই পরিমাণে আদর আর যত্ন পাওনি। শৈশবকালীন অন্তত প্রথম পাঁচটি বছর মানবশিশুর প্রচুর চাহিদা থাকে ভালোবাসা, যত্ন ও নৈকট্য পাওয়ার জন্য। সেটি যদি সে ঠিকমতো না পায়, তাহলে তার মধ্যে অনিরাপত্তাবোধ ও ভীতির সৃষ্টি হয়। পরিচর্যাকারী শিশুর শরীরের যত্ন কিছুটা নিশ্চিত করলেও মানসিক চাহিদাগুলোর প্রয়োজন বুঝতে না পারার কারণে সেটির দিকে খেয়াল করেন না। ফলে শিশুটি বড় হওয়ার পরও তার ভেতরে একটি অনিশ্চয়তাবোধ থেকে যায়। জীবনে চলতে গিয়ে সে যখন কারও প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে তখন অবচেতনভাবেই তার প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তার মধ্যে স্নেহের ক্ষুধা খুব তীব্র থাকে, সে বুঝতে পারে না সম্পর্কটিতে কতটা মানসিক প্রাণশক্তি বা সময় ব্যয় করা উচিত।

অপর পক্ষের যদি একই রকম আকর্ষণ অনুভূতি না-ও হয়, তারপরও অন্যজনের এই নির্ভরশীলতা তার জন্য বেশ কিছু সময় পর্যন্ত উপভোগ্য হয়। সে তার কাছ থেকে সুবিধাগুলো গ্রহণ করতে থাকে। আবার কখনো বিরক্তি বোধ করলে সে দুর্ব্যবহার করে এবং অপমানজনক কথাবার্তা বলে ফেলে। তুমি যে জীবনের অন্য সংগ্রামগুলো সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছ এবং কখনো হার মানোনি, সেটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এ ধরনের ধাক্কাগুলো অত্যন্ত দুর্বিষহ হলেও, এ কষ্টের অভিজ্ঞতা থেকে যা শিখেছ, তা কিন্তু সঞ্চয় করে রাখবে। আশা করছি, এরপর অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক হলে তুমি নিজেকে এভাবে উজাড় করে দেবে না। প্রথমে নিজেকে গুরুত্ব দিয়ে মনের ও শরীরের যত্ন করবে। আর কখনো কোনো অবস্থায় আত্মসম্মান বিসর্জন দেবে না, কেমন? [সুত্রঃ প্রথম আলো]