জনগণ ও ব্যাংকের টাকা খাচ্ছে ঋণ খেলাপিরা

জনগণ ও ব্যাংকের টাকা খাচ্ছে ঋণ খেলাপিরা

SHARE
loan defaulting are eating public and bank's money

ঋণ খেলাপিদের দৌরত্বে ব্যাংক ও গ্রাহকদের নাভিশ্বাস ওঠেছে।  ২০১৬ সালে দেশে ৬২ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়।  যা ২০১৫ সালে ছিল ৫২ হাজার কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) ঘাটতিতে পড়ে অনেক সরকারি ব্যাংক গতি ও মূলধন হারাতে বসেছে। মূলধন হারিয়ে বাজেট ঘাটতির জন্য প্রতি বছরের মতো এবারো বাজেট ভুর্তকীর জন্য প্রহর গুনছে ব্যাংকগুলো। আর সরকার ‘মূলধন পুনর্গঠনে বিনিয়োগ’ নামে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়ে আসছে গেলো প্রতি বাজেটে। ফলে ঋণ খেলাপি ও অসৎ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসূত্রে প্রতিবছরই মূলধন ঘাটতিতে ভুগে ব্যাংকগুলো।

বৃহস্পতিবার ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তাতে এসব ব্যাংকগুলোকে ২ হাজার কোটি টাকা দেয়ার ঘোষণা থাকতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৫-১৬ পর্যন্ত (২০১৬-১৭ অর্থবছর বাদে) আট বছরের ক্রমবর্ধমান রাজস্ব আয় থেকে সরকার গড়ে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থ দিয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মূলধন জোগানে।

ব্যাংকগুলোর নিজেদের দেয়া হিসেবে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ৫টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। ঘাটতি মূলধনে রয়েছে সোনালী ব্যাংক ৩ হাজার ৪৭৫ কোটি, বেসিক ব্যাংক ২ হাজার ৬৮৪ কোটি ও রূপালী ব্যাংক ৭১৫ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ৭ হাজার ৮৩ কোটি টাকা, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ৭৪২ কোটি টাকা। তবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মূলধন জোগান দিতে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ রেখেছিল।

এদিকে, বাজেট নিয়ে আলোচনা চলতে না চলতে মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যাংকের কর্তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ে বেশ তদবির করেছিলেন। নিজেদের ঘাটতি পূরণে তারা ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূলধন জোগান চেয়ে আবেদন করেন।  এদিকে ২০১১-১২ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত ১৪ হাজার ৫৫০ কোটি বরাদ্দ রাখা হয় মূলধন ঘাটতি পূরণে। এরমধ্যে মূলধন ঘাটতিতে বেশি বরাদ্ধ দেয়া হয় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫ হাজার কোটি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫ হাজার ৬৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন এ বিষয়ে জানান, সরকারি ব্যাংকগুলো দুর্বল হচ্ছে নিজস্ব অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে। জনগণ কেন সেই অদক্ষতা, দুর্নীতির ভাগ নেবে? সরকারি ব্যাংকগুলোকে চলতে হবে নিজের অর্থে। জনগণের করের টাকা দিয়ে মূলধন যোগান দিতে থাকলে এসব ব্যাংক কখনোই নিজের শক্তি-সক্ষমতা দাঁড়াতে পারবে না।  এটা যৌক্তিক নয়, নৈতিকও নয়।  মানুষ তো তার করের টাকা দুর্নীতিকে উৎসাহিত করার জন্য দিতে পারে না। অসংখ্যবার সরকারি ব্যাংকগুলোকে এ সুযোগ দেয়া হয়েছে, তা আর নয়।  এবারের বাজেটে যেনো এ ধরনের কোন বরাদ্দ না রাখা হয় সে দিকে নজর দিতে হবে।

মূলত ব্যাংকে বিনিয়োগকারীর টাকাকে ঋণ প্রদান করে আয় করে। কিন্তু ঋণের নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ না করায় তা ঋণ খেলাপিতে রূপ নেয়। এতে ব্যাংকের আয় ও গতি কমে গিয়ে বেড়ে যায় দায়বদ্ধতা। কমে যায় ব্যাংকের বিনিয়োগ। একসময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যাংকের চাকা।

এদিকে ব্যাংকের আয়ের বিশাল একটি অংশ খেলাপি ঋণের ঘাটতি মেটাতে ব্যয় করতে হয়। কিন্তু খেলাপি ঋণ যদি ব্যাংকের আয়ের সমান হয় তাহলে আয়ের পুরোটা প্রভিশন ঘাটতিতে ব্যয় করতে হয়।

অপরদিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ যদি ব্যাংকের আয়ের চেয়ে বেশি হয় তাহলে সেক্ষেত্রে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যাংক নাজুক হয়ে পড়ে।

কিন্তু ব্যাংক বিশেষজ্ঞরা বলছে, ঋণ প্রদানে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা-আমলা এবং ব্যাংকের অসৎ কর্তারা জড়িত হয়ে যোগসূত্রে কাজ করে। তবে ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কর্তারা খেলাপি ঋণ সৃষ্টির জন্য দায়ী থাকে।  আর বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকরা জড়িত থাকে।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সংসদে বলেছেন বিভিন্ন সরকারি ব্যাংকে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪৪ হাজার ৮০১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। তবে চলতি (২০১৬-১৭) অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সব সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বিপরীতে নগদ আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে  ১ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা।

চলতি বছরের ব্যাংকগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনে সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। পরে আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে আরো ৪ হাজার ৭১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের তথ্য ফাঁস হয়। এর মধ্যে জনতায় ১৭৭১ কোটি, অগ্রণীর ৯২৭ কোটি, রূপালীর ৬৯১ কোটি ও সোনালী ব্যাংকে ৬৮২ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক হতে আরো জানা যায় ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সব তফসিলি ব্যাংকগুলো প্রায় ৬ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। এরমধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে অবলোপন করা কু-ঋণ রয়েছে আরো ৪২ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা।

এ সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই সর্বাধিক পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৩০২ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছিল। এরমধ্যে খেলাপি হয়েছিল ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা।

এদিকে খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। এরমধ্যে আদায় অনিশ্চিত ২ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ৪ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। আদায় অনিশ্চিত ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের খেলাপি ১ হাজার ৫ কোটি টাকা। আদায় অনিশ্চিত ৭০৯ কোটি টাকা। এছাড়া ফারমার্স ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৭১ কোটি টাকা।  এর মধ্যে আদায় অনিশ্চিত ৯৬ কোটি টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংকের খেলাপি রয়েছে ৪৪৪ কোটি টাকা। যাতে আদায় অনিশ্চিত ৪১৩ কোটি টাকা।

এদিকে ব্যাংক এশিয়ার খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮০৫ কোটি টাকা। যা আদায় অনিশ্চিত ৭৪৪ কোটি টাকা। এনসিসি ব্যাংকের খেলাপি রয়েছে ৬৮২ কোটি টাকা। এতে আদায় অনিশ্চিত ৫৫৩ কোটি টাকা।

এছাড়া যমুনা ব্যাংকের খেলাপি ৪০৫ কোটি টাকা। আদায় অনিশ্চিত ৩৭৩ কোটি টাকা। সিটি ব্যাংকের খেলাপি ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা। আদায় অনিশ্চিত ৯২০ কোটি টাকা।

এছাড়া ডাচ-বাংলা ব্যাংকের খেলাপি ৮৬৩ কোটি টাকা। আদায় অনিশ্চিত ৮১৪ কোটি টাকা। এবি ব্যাংকের খেলাপি ৬৬৬ কোটি টাকা। আদায় অনিশ্চিত ৫৫৯ কোটি টাকা। আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের খেলাপি ৬৭২ কোটি টাকা। আদায় অনিশ্চিত ৬৬২ কোটি টাকা। উত্তরা ব্যাংকের খেলাপি ৬২৬ কোটি টাকা। আদায় অনিশ্চিত ৪৪৫ কোটি টাকা। এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। এরমধ্যে আদায় অনিশ্চিত ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা।

অপরদিকে বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার খেলাপি ঋণ ৫৭ কোটি টাকা। আদায় অনিশ্চিত ৪৪ কোটি টাকা। কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের খেলাপি ৫০ কোটি টাকা। এ ব্যাংকেও আদায় অনিশ্চিত ৪৭ কোটি টাকা এবং উরি ব্যাংকের খেলাপি প্রায় ৩১ কোটি টাকা। আদায় না হওয়ার হিসাবে আছে ২৯ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির বলেন, খেলাপি কমিয়ে আনা ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলেও মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সরকার চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য ৭ দশমিক ২ এবং আগামি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য ৮ শতাংশ হারের যে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা হাতে নিয়েছে তার বাস্তবায়ন করতে প্রচুর টাকার প্রয়োজন। তাই খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে না পারলে এ বিপুল পরিমাণ অর্থের যোগান দেয়া সম্ভব হবে না।

খেলাপির মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে: সোনালী ব্যাংকের হোটেল শেরাটন শাখা হতে হল-মার্ক গ্রুপসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া অভ্যন্তরীণ বিল ক্রয়ের ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারি। টেরি টাওয়েলস রপ্তানির ভুয়া তথ্যে বিসমিল্লাহ গ্রুপের ১২শ’ কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারি।

এছাড়া চট্টগ্রামে ইস্পাত খাতে ২৮ প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার ঋণের খেলাপির ঘটনা। যার মামলা চলমান রয়েছে।

গ্রাহককে জেনে শুনে ঋণ দেয়া (কেওয়াইসি) নিয়ে সরকারের বিভিন্ন কর্তারা ব্যাংককে বারবার তাগাদা দিলেও তাতে কর্ণপাত করছেনা তারা। খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও অগ্রণী ব্যাংকের ৫শ তম সভায় ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে খোঁজ খবর নিতে ব্যাংকের পরিচালকদের নির্দেশ দেন।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের যে সুবিধা দেয়া হয়েছিল, বিশেষ সেই সুবিধা পাওয়া ঋণের বর্তমান অবস্থা জানতে গেলো ১৭ এপ্রিল ব্যাংকগুলোর কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

চিঠিতে বলা হয়, যে সব শর্ত মেনে বিশেষ সুবিধা নেয়া হয়েছিল সেগুলো মানা হচ্ছে কিনা, গ্রহীতারা ঠিকমতো ঋণ ফেরত দিচ্ছে কিনা, অথবা ওই ঋণ আবার খেলাপি হয়েছে কিনা, এসব বিষয়ে জানার জন্য ব্যাংকগুলোর কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে চিঠিতে। ৯ মের মধ্যে চিঠির জবাব পাঠাতেও নির্দেশনা দেয়া হয়।

গেলো ১৮ এপ্রিল খেলাপি ঋণ রোধে রাষ্ট্রায়াত্বসহ ২০ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ঋণ খেলাপি কমাতে কঠোর নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন, তারা ভালো গ্রাহক। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের গ্রাহককে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হয়। অথচ মন্দ গ্রাহকরা ব্যাংকের কাছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। যদিও মন্দ গ্রাহককে দেয়া ঋণ কোনো দিন ফেরত আসবে না, এটা সবাই জানে। তবে ঋণ খেলাপী রোধে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। [সূত্রঃ আরটিভি]

LEAVE A REPLY