প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন

প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন

SHARE
Coral island Saint Martin

বাংলাদেশের ভ্রমণ পিপাসুদের পছন্দের তালিকায় অন্যতম একটি স্থান প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। ছোট একটি দ্বীপ, তার চারপাশেই শুধু পানি আর পানি। সাগর বুকে দাড়িয়ে আছে ছোট এই দ্বীপ। মন মাতানো সূর্যাস্ত, বাতাস আর সমুদ্রের গর্জন—এই নিয়েই ‘সেন্ট মার্টিনস’। বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটিই হচ্ছে সেন্ট মার্টিন।

সারাবছর জুড়ে পৃথিবীর নানা দেশের বহু মানুষের ভিড় লেগে থাকে প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে। দ্বীপে মানুষের জীবনযাপন, সমুদ্রের নীল পানির সঙ্গে চমৎকার মিতালি অন্য রকম ভালো লাগা তৈরি করে। আকাশ আর সমুদ্রের নীল এখানে মিলেমিশে একাকার। তীরে বাঁধা নৌকা, সারি সারি নারকেলগাছ আর ঢেউয়ের ছন্দ, কখনো থেমে থেমে, কখনো আবার দমকা হাওয়ার স্পর্শ। প্রায় সবসময় পৃথিবীর নানা দেশের নানান রঙের মানুষের ভিড় লেগেই থাকে এই প্রবাল দ্বীপে।

Coral island Saint Martin

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ এর আদি নাম ছিল নার্জিল জাজিরা বা জিঞ্জিরা। জাজিরা থেকে জিঞ্জিরা শব্দের উৎপত্তি। জিঞ্জিরা শব্দের অর্থ উপদ্বীপ, আর নার্জিল অর্থ নারিকেল। এই দ্বীপ এ নারিকেল গাছের আধিক্য ছিল।এখনো নারিকেল এর জন্য এই দ্বীপ এখনো বিক্ষাত। আর এজন্যেই এই দ্বীপকে নারিকেল জিঞ্জিরা ও বলা হয়।

এই দ্বীপের সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই যে ব্যাপার টি চলে আসে, সেটি হচ্ছে এখানের প্রকৃতি আর তার নির্জনতা। খুব নির্জন আর কোলাহল মুক্ত কয়েকটি দিন কাটানোর জন্য এই দ্বীপ অন্যতম, কারণ দ্বীপে কোন বাস, গাড়ি, মোটর চালিত কোন প্রকার যান নেই

‘সেন্ট মার্টিন’ এর অবস্থান বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের জেলা কক্সবাজারের টেকনাফ থানায়। টেকনাফ থেকেও প্রায় ৯-১০ কিঃ মিঃ দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এর বুকে এই দ্বীপ এর অবস্থান। আয়তনে খুব বড় নয় এই দ্বীপ, ৮ বর্গ কিঃ মিঃ, আর লোক সংখ্যা প্রায় ৭০০০-৭৫০০ এর মতনCoral island Saint Martin

যা যা দেখতে পাবেন

সেন্ট মার্টিনে আলাদা করে দেখার মত কিছু আলাদা করা কঠিন, কারণ পুরো দ্বীপ টি ই একটি মিস্ট্রি। স্বচ্ছ আর নীল পানি দেখে স্থির থাকা কঠিন। ইচ্ছেমতো পানিতে সাঁতার কাটতে পারেন। তবে ভাটার সময় পানিতে না নামাই ভালো। দ্বীপের দক্ষিণ দিকে প্রচুর পরিমাণে কেওড়ার ঝোপঝাড় আছে। কিছু ম্যানগ্রোভ বন আছে। অন্যান্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে শেওলা, সাগরলতা, বাইনগাছ ইত্যাদি। সেন্ট মার্টিনে বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল প্রচুর পাওয়া যায়। এর মধ্যে লাল অ্যালগি সবচেয়ে জনপ্রিয়। ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীসহ রয়েছে অসংখ্য স্পঞ্জ, শিল কাঁকড়া। সেন্ট মার্টিন গেলে দেখতে পাবেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বহুল আলোচিত ‘সমুদ্র বিলাস’।

Coral island Saint Martin

যা যা করবেন না

  • মোট ১১ টি ডেঞ্জার জোন আছে। এই জোনে পানিতে না নামাই ভালো। কয়েকটি জায়গাতে লাল পতাকা দিয়ে চিহ্নিত করা আছে। সেখানে যাবেন না।
  • যেখানে সেখানে চিপসের প্যাকেট, পলিথিন যাতীয় কিছু ফেলবেন না। এমন কি সিগারেটের অবশিষ্টাংশও দ্বীপের জন্য ক্ষতিকর।
  • মনে রাখবেন পাথুরে সৈকত, প্রবাল ও নীল সমুদ্র আমাদের দেশে শুধুমাত্র এখানেই আছে। এই দ্বীপটি ২০০৫ সালে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষিত। তাই সৃতি হিসেবে এখান থেকে প্রবাল, শৈবাল, সামুক-ঝিনুক, কেয়া গাছের ফল নিয়ে আসবেন না। এটা শুধু অনুচিতই নয় বরং দণ্ডনীয় অপরাধও বটে।
  • সেন্ট মার্টিনে প্রচুর কোরাল রয়েছে সারা বীচ জুড়ে। এগুলো খুবই ধারালো। তাই সাবধানে বীচে নামুন।
  • ভাঁটার সময় পানিতে নামবেন না।

Coral island Saint Martin

কি কি খাবেন

* সেন্ট মার্টিন কে নারিকেল জিঞ্জিরা বলার কারণ ই হল এই দ্বীপে প্রচুর পরিমাণ ডাব পাওয়া যায়, যার স্বাদ অনন্য, আর দেখতেও সাধারণ ডাবের চেয়ে দুই বা তিন গুণ বড় ও হয়, আবার দাম ও হয় তুলনামূলক কম। তাই এই জিনিস খুব কম মানুষ ই মিস করতে চাইবেন।

* সামুদ্রিক মাছ, কাকড়া, লবস্টার এই দ্বীপের প্রধান আকর্ষণ। (কোরাল, সুন্দরী, ইলিশ, রূপচাঁদা, চিংড়ি বেশি বিক্ষাত)

* শুটকি মাছ যারা পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই দ্বীপ শুধু শুটকির জন্যেই আদর্শ দ্বীপ হয়ে যেতে পারে, কারণ এখানে অনেক প্রকারের একদম ফ্রেশ শুটকি পাওয়া যায়।

* পাশেই যেহেতু মায়ানমার, সেহেতু সেই খানে তৈরি অনেক প্রকার আচার যা ইতিপূর্বেই মানুষের মন জয় করে নিয়েছে, তা মোটামুটি সহজলভ্য সেন্ট মার্টিনে।

থাকা ও খাওয়া

ঝামেলা এড়াতে চাইলে আগে থেকে বুক করে আসাই ভালো। কয়েক ধরনের হোটেল আছে সেন্ট মার্টিনসে। খুব রিলাক্সে থাকতে চাইলে বাজারের পাশের হোটেলগুলো ভালো। ব্লু মেরিন, স্যান্ড শোর (০১৮১৫ ৬৪৮৭৩১), সি ইন, প্রাসাদ প্যারাডাইস (০১৭৯৬ ৮৮০২০৭), কোরাল ভিউ (০১৯৮০ ০০৪৭৭৮) বাজারের পাশেই। এগুলোর ভাড়া তুলনামূলক একটু বেশি। আর সমুদ্রতীরে থাকতে চাইলে আছে ব্লু লেগুন (০১৮১৮ ৭৪৭৯৪৬, ০১৭২৩ ৫৮৬৮৭৭), হুমায়ূন আহমেদের সমুদ্র বিলাস (০১৮১৩০১৯৮৩৯), ড্রিম নাইট (০১৭১০ ৩৯০২৫১), সীমানা পেরিয়ে (০১৮১৯ ০১৮০২৭)। এগুলো মোটামুটি সবার পরিচিত। সিজনে এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকার কমে সেন্ট মার্টিনসে রুম পাওয়া কষ্টসাধ্য। আর অফ সিজনে ৭০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকায় পাওয়া যাবে সি রিসোর্টগুলো। রিসোর্টের প্রতি রুমে চারজন করে আরামে থাকা যায়।

Coral island Saint Martin
হুমায়ূন আহমেদ স্যারের সমুদ্র বিলাস

যাতায়াতঃ

বাংলাদেশের যেকোনো স্থান থেকে সেন্ট মার্টিন যাওয়ার জন্য প্রথমে আপনাকে কক্সবাজার যেতে হবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার থেকে বাসে করে টেকনাফ যাওয়া যাবে। ঢাকার ফকিরাপুল ও সায়েদাবাদে টেকনাফের বাস পাওয়া যায়। ঈগল, মডার্ন লাইন, এস আলম, শ্যামলী ইত্যাদি বাস টেকনাফ যায়। ১০-১৩ ঘণ্টা লাগে পৌঁছাতে। এছাড়া কক্স-বাজার থেকে বাস, মাইক্রো বাস বা জিপে করেও টেকনাফ যেতে পারেন।

এবার টেকনাফ থেকে সি-ট্রাক, জাহাজ কিংবা ট্রলারে চড়ে পৌঁছাবেন সেন্ট মার্টিনে। টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনে প্রতিদিন সকাল থেকে যাওয়া-আসা করে করে সি-ট্রাক, কেয়ারি সিন্দাবাদ ও নাফসি জাহাজ। এর পাশাপাশি স্পিডবোটও চলাচল করে। যারা অ্যাডভেঞ্চার করতে চান, তারা স্পিডবোটেই যেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ভাড়া পড়বে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। জাহাজে চড়ে টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিন যেতে সময় লাগে তিন ঘণ্টা। প্রতিদিনই জাহাজগুলো সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টায় ছেড়ে দেয় আবার বিকেল ৩টায় সেন্ট মার্টিন ছাড়ে। শীত মৌসুমে সমুদ্র শান্ত থাকে। আর গ্রীষ্ম-বর্ষায় উত্তাল থাকে, তখন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ।

কিছু টিপস

  • সেন্টমার্টিন যাওয়ার জন্য ঢাকা থেকেই, কেয়ারীসহ বেশ কিছু ট্রাভেল এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করে যেতে পারেন।
  • নভেম্বর থেকে মার্চ পযন্ত মাত্র ৪ মাস জাহাজ চলে। অন্য সময় যেতে হলে ট্রলারে করে যেতে হবে।
  • সেন্টমার্টিনে এখন অনেক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ আছে তাই থাকার জায়গার অভাব হয় না।
  • সাশ্রয়ী দামে থাকতে শুক্রবার-শনিবার দ্বীপে না যাওয়াই ভালো।
  • দ্বীপে সবকিছু বাইরে থেকে যায়, তাই খাবার খরচ তুলনামূলক বেশি।
  • তিনদিনে জনপ্রতি খরচ হবে ৫-৬ হাজার টাকা। দলবল বড় করে আরো কমে ৩-সাড়ে ৩ হাজার টাকায় ঘুরে আসা যায়।